লেখক ও প্রশিক্ষক, পল্লব কুমার মান্না , জীবন প্রবাহ

(১) কাস্টমার হলো “কিং” বা রাজা : স্যাম ওয়াট শোন আমেরিকান বিজনেসম্যান বলেছেন যে ব্যবসার জগতে একজনই “বস” আছে। যিনি হলেন কাস্টমার সে একটি কোম্পানির চেয়ারম্যান থেকে নিয়ে সকলকেই কোম্পানি থেকে নিষ্কাশন করে দিতে পারে । এই স্যাম ওয়াটসন হলেন ওয়ালমার্ট -এর প্রতিষ্ঠাতা । পৃথিবীতে এমন কোন রকেট সায়েন্ট নেই যার দ্বারা কাস্টমার ছাড়া আপনার ব্যবসা কে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন । আপনি যত ভালই সেলসম্যান হোন না কেন যদি না আপনার গ্রাহক আপনার কথায় ভালো কিছু অনুভব না করেন , আপনার সেই সেলিং স্কীলএর কোনো দাম নেই। যখনই আপনি আপনার গ্রাহকের কথা ভাবা বন্ধ করে দেবেন তখনই আপনার বিক্রয় পদ্ধতি ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।
(২) কমিউনিকেশন বা যোগাযোগ একটি বিরাট গুরুত্বপূর্ণ জিনিস : বিশ্ব বিখ্যাত প্রশিক্ষক এবং লেখক ব্রাইনট্রেশি বলেছেন যে কমিউনিকেশন শিল্প হল এমন একটি শিল্প যেটি আপনি শিখতে পারেন। যেমন ভাবে আমরা বাইসাইকেল চড়া শিখি, টাইপ করতে শিখি । যদি কেউ এই শিল্পে কাজ করতে আগ্রহী হয় তাহলে শুধু কমিউনিকেশন শিল্পের নয় তার জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে নানান স্কীল তৈরীতে তিনি দ্রুত উন্নয়ন করতে পারবেন। প্রযুক্তি এগিয়ে চলেছে এবং বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির দৌলতে আমরা অতি সহজেই দূরের বা কাছের সকল ব্যক্তিকে সংযুক্ত করতে পারি । সেলসম্যানকে আরো একধাপ এগিয়ে থাকতে হবে । আমরা আমাদের কাস্টমার বা ক্রেতাদের সাথে যুক্ত থাকার বা তাকে এনগেজ করা নতুন রাস্তা পেয়েছি — সোশ্যাল মিডিয়া। একটি সার্ভে রিপোর্ট অনুসারে জানানো হচ্ছে যে প্রায় 40 % থেকে 45% মানুষ তার প্রিয় ব্র্যান্ড বা প্রিয় প্রোডাক্ট বা প্রয়োজনীয় পণ্য এবং পরিষেবা খুঁজে নেওয়ার জন্য সোশ্যাল নেটওয়ার্কের দ্বারস্থ হন বা তার দ্বারা প্রভাবিত হন । একজন দক্ষ সেলসম্যান হিসেবে আপনার কাজ হল প্রতিটি নতুন কমিউনিকেশন চ্যানেল কিভাবে আপনার ব্র্যান্ডের সাথে কাস্টমারের অভিজ্ঞতাকে নানান দিক থেকে সংযুক্ত করে সেটা বুঝে নেওয়া যাতে করে আপনি ভুল সময়ে ভুল কাজ না করেন।
(৩ ) পথের বাধা গুলিকে আলিঙ্গন করুন: একজন সেলসম্যানের সবচেয়ে বড় বাধা হল “রিজেকশন” বা প্রত্যাখান । একজন সফল ব্যক্তি এবং অসফল ব্যক্তির মধ্যে পার্থক্য হল এটাই যে সফল ব্যক্তি সেই সকল জিনিস করেন যে সকল জিনিস একজন অসফল ব্যক্তি করতে চান না। যখন আপনার সামনে ১০ টি দরজা বন্ধ হয়ে যাবে তখন ১১ তম দরজাতে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে এবং মুখে হাসি নিয়ে পৌঁছে যান।
সবকিছু পাল্টে যায় কিন্তু পরিবর্তনই একমাত্র ধ্রুবক । আর সেলসের ক্ষেত্রে এই কথা কথাটি দ্বিগুণ সত্য । কাস্টমারের বাধা সহ্য করার প্রথম শ্রেণীতে আছেন সেলসম্যান। শুধু বাধা নয় কাস্টমারের থেকে আসা নেগেটিভিটি তাকে মোকাবিলা করতে হয়। যারা সফল তারা সর্বদাই নেগেটিভকে পজেটিভ -এ পরিবর্তন করতে নতুন রাস্তা সন্ধান করেন। সত্য কথা বলতে গেলে বলতে হয়, সব সময় কিছু না কিছু শিখতেই হবে। রিজেকশান এবং নেগেটিভ ফিডব্যাক আপনাকে সর্বদা এই শিক্ষা পেতে সহায়তা করে যে কোথায় আপনি ভুল করছেন এবং পরের বার আপনি আরো ভালো কিভাবে করবেন।
৪ ) ভালো “অভিজ্ঞতা”কে বিক্রয় করুন : জেফ বেজস — এমাজন সংস্থার প্রবর্তক এবং চেয়ারম্যান , বলেছেন যে যে কাস্টমাররা একে অপরের কাছে অভিজ্ঞতা বিনিময় করে । আপনি যদি আপনার প্রোডাক্ট এবং আপনার ব্র্যান্ডের সুন্দর অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারেন তাহলে সেটি অত্যন্ত কার্যকরী হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় যে amazon সংস্থা প্রতিবছর নানান ভাবে তার গ্রাহকদের ফিডব্যাক গ্রহণ করে থাকেন এবং প্রতিমাসে প্রায় 40 লক্ষ ফিডব্যাক তারা সংগ্রহ করে থাকেন । বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে আপনার বিক্রয় কাজের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী অস্ত্র হলো “ওয়ার্ড অফ মাউথ পাবলিসিটি” বা মুখে মুখে প্রচার। যদি আপনার সম্পর্কে মুখে মুখে প্রচার শুরু হয় তাহলে লক্ষ লক্ষ টাকার গল্প শুরু হবে অর্থাৎ আপনার ব্যবসা বিরাট পরিমাণে বাড়বে । আমরা যদি সোশাল মিডিয়া প্লটফর্ম ইনস্টাগ্রামের বিষয়টা দেখি তাহলে এই ইনস্টাগ্রাম কে কয়েক বছর আগেও মানুষ চিনতেন না কিন্তু মুখে মুখে প্রচারের দ্বারা বর্তমানে 235 কোটির উপর গ্রাহক এই ইনস্টাগ্রামের ব্যবহার করেন ।
৫ ) ভ্যালু বিক্রয় করুন প্রোডাক্ট নয় (Sell Value not things ) : অনেক সেলসম্যান প্রোডাক্ট বিক্রয়ের দিকে জোর দেন কিন্তু সঠিক সেলসম্যান মানুষকে ভ্যালু প্রদান করে ।
৬ ) মানুষের যেটা দরকার সেটা দিন, যেটা তারা চাইছে সেটা নয় : মানুষের চাহিদা প্রতিনিয়ত পাল্টাচ্ছে তাই তারা কি চাইছে এটা দেখার পর সেই ভাবে পণ্য সাজাবার চেষ্টা না করে তাদের কি দরকার হবে সেই দিকে ধ্যান দিন ।
৭) ইমোশনের দিক থেকে যুক্ত হন : আপনি তখনই এগিয়ে যাবেন যখন আপনার বর্তমান এবং সম্ভাব্য ক্রেতারা আপনার সাথে কাজ করে খুশি থাকবেন । তাই এই বিষয়ে সময় দিন, মনোযোগ দিন এবং তাদেরকে সবচেয়ে উন্নত পরিষেবা এবং তথ্য প্রদান করুন এর বিনিময়ে আপনি পাবেন অনেক নতুন নতুন কাস্টমার এবং পুরাতন কাস্টমারের আনুগত্য। সেলসের ক্ষেত্রে ভ্যালু বা মূল্য তৈরীর যে বিষয়টি আসে সেটি সবচেয়ে ভালো তৈরি হয় সুন্দর ইনফরমেশন এবং ইনস্পিরেশন এর দ্বারা।
৮) কাস্টমারের সাথে কথা বলুন, কাস্টমারদের উদ্দেশ্যে নয় (talk with the customer, not to the customer): বর্তমানেও আছে , তবে অদূর ভবিষ্যতে কাস্টমারদের সাথে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠবে বিভিন্ন চ্যানেল, যেমন- ফোন, ইমেইল, চ্যাট, ওয়েবসাইট, সোশ্যাল নেটওয়ার্ক। কাস্টমার বিভিন্ন প্লাটফর্মে বিভিন্ন প্রোডাক্ট এবং প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা বলেন এবং অনেকে সেখানে তাদের অভিজ্ঞতাও শেয়ার করেন । আপনাকে তাদের কথোপকথনে যুক্ত হতে হবে।
কখনোই কাস্টমারের মতামত সম্পর্কে আগাম অনুমান করবেন না বরং তাদের কাছে পৌঁছে যান এবং তাদের সাথে কথা বলুন। অনেক সময় দেখবেন গ্রাহকরা আপনার প্রোডাক্ট এবং আপনার সার্ভিস নিয়ে আপনাকে এমন নতুন ধরনের গভীর বিশ্লেষণ দেবেন যেটা আপনি কল্পনাই করতে পারেননি । নিজের সাথে নিজেকে এই প্রশ্ন করুন যে তাদের আমার প্রোডাক্ট কেন দরকার, কোন বিষয়টা তাদেরকে কেনার জন্য অনুপ্রাণিত করবে, তারা এই প্রোডাক্ট বা এই পরিষেবা কিভাবে ব্যবহার করছে বা করবে? এই প্রশ্নগুলির বাস্তব উত্তর আপনাকে ভবিষ্যতে আরও বেশি ব্যবসা আনতে সহায়তা করবে।
৯ ) বড়ো মাপের সেলস ক্লোজ করার ঝুঁকি নিন : বেশীরভাগ সেলসম্যান খুব ভালো “সেলস ক্লোজ” করতে পারেন না । অনেক সময় অনেক সেলসম্যান বড় ক্লোজ করতে বা বড় মাপের প্রিমিয়াম ক্লোজ করতে পারেন না তারা এই ঝুঁকি নিতে পারেন না যে বড় ক্লোজ করতে গিয়ে হয়তো আদৌ এই পলিসিটা উনি করতে পারবেন না। এর থেকে উদ্ধারের উপায় হলো আপনি তার জন্য একজন সিদ্ধান্তকারী ব্যক্তিতে পরিণত হন ।
১০) কেবল রেডি সেলস স্ক্রিপ্ট এবং স্পেশাল সেলস টেকনিক অবলম্বন করেই যে আপনার ভালো রেজাল্ট আসবে এমনটা নয় : অনেক সময় অনেক গোপন বাধা থাকে, যেগুলোকে অতিক্রম করতে হয়। অবশ্যই আগে থাকতে তৈরি করা সেলস স্ক্রিপ্ট আপনাকে অনেক সহায়তা করবে , কিন্তু বাস্তবে প্রত্যেকটি সেলস প্রেজেন্টেশন পৃথক পৃথক হয় । তাই আপনাকে চেষ্টা করতে হবে কিভাবে আপনি আপনার সম্ভাব্য ক্রেতাকে রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন অর্থাৎ এর মানে হলো তাকে সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করা । শুধু সহায়তা নয়, তার হয়ে সিদ্ধান্ত তৈরি করে দেওয়া ।
১১) ভালো করে শুনুন এবং আপনি আপনার দুটি কানকে সুন্দর করে ব্যবহার করুন : সত্যিকারের শোনা বলতে বোঝায় কাস্টমারের প্রয়োজন বা প্রয়োজনীয়তাগুলি শোনা । সেই সাথে কোন কোন জায়গায় তার প্রয়োজন মেটানোর জন্য আপনি প্রস্তুত, পাশাপাশি সেটা বুঝে নেওয়া। বর্তমান অনলাইনের যুগে দেখা যাচ্ছে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ তাদের ক্রয়ের পদ্ধতির মধ্যে সেলসপার্সেন এর উপর নির্ভরশীল না হয়ে বিভিন্ন ইনফরমেশন দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন। এই জায়গায় একজন সেলসম্যানকে তার ভূমিকার বদল করতে হবে । তাকে একটি এডভাইজারের ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। আর এটা সহজ হবে তখন যখন আপনি আর্ট অফ লিশনিং বা শোনার শিল্প ভালো করে রপ্ত করতে পারবেন । কাজটা কিন্তু খুব সহজ নয়। কিভাবে কথা বলতে হয় এই বিষয়ে হয়তো আপনি অনেক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন, কিন্তু অ্যাক্টিভ ভাবে প্রস্পেক্ট এর কথা কিভাবে শুনতে হয় (active listening and empathetic listening ) এটা অনেক সময় আমরা করি না । যদি আপনি এটা করেন তাহলে সেলস ক্লোজ করতে অনেক সহায়তা হবে । কারণ আপনি কাস্টমারের সাথে সত্যিকারের বিশ্বাস -এর সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হবেন । এটা সর্বদা স্মরণে রাখবেন যে, মানুষ তার সাথেই ব্যবসা করতে পছন্দ করে যাকে তারা পছন্দ করে।
১২) প্রত্যেকটি কাস্টমারকে নিজেকে অনন্য বা ইউনিক অনুভব করান (make every customer feel unique): আপনার প্রতিটি কাস্টমার নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ অনুভব করতে পছন্দ করবে। আপনার কাস্টমারকে একটি অতিথির মতো করে গ্রহণ করুন। আপনি তাকে জানান যে কেন তিনি আপনার কাছে স্পেশাল । আর এর দ্বারাই আপনি তার আনুগত্য অর্জন করতে পারবেন । তাই অর্থাৎ বিশেষ কেবলমাত্র ওনার জন্য (ইউনিক এক্সক্লুসিভ এবং অ্যাপ্রিসিয়েশন )—এমনটা যদি তিনি অনুভব করেন, তাহলে খুব ভালো কাজ হবে।
নানান নতুন তথ্য ও প্রবন্ধ পড়ে ব্যবসা বাড়াতে চান ? https://pallabmanna.com/know-jeevan-prabaha/
https://pallabmanna.com/know-jeevan-prabaha/
সুযোগ দ্রুত শেষ হচ্ছে !

Leave a comment