জীবন প্রবাহ প্রবন্ধ : অনুলেখক পল্লব কুমার মান্না , FIII

মাসকাবারির দিন মোবাইলে “Salary Credited” মেসেজটা আসা মাত্রই মনটা একটু হালকা হয়, তাই না? কিন্তু হাত খোলার আগেই বুকটা টিপটিপ করে ওঠে। কারণ আমরা জানি, পরের কয়েকদিনের মধ্যেই ক্রেডিট কার্ডের বিল, ফ্ল্যাট বা গাড়ির EMI, আর দৈনন্দিন খরচের ধাক্কায় সেই টাকা কর্পূরের মতো উড়ে যাবে। মাসের শেষে পড়ে থাকবে শুধু একটা প্রশ্ন—“এত টাকা আয় করলাম, গেল কোথায়?”

আজকের ভারতের মধ্যবিত্ত সমাজের এটাই সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি। আমরা কঠোর পরিশ্রম করি, ভালোই আয় করি, তাও একটা অদৃশ্য আর্থিক চক্রে আটকে থাকি। আমরা ভাবি, “আরেকটু বেশি মাইনে পেলেই বোধহয় সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।”

কিন্তু নির্মম সত্যটা হলো: যদি আপনার অভ্যাস না বদলায়, তবে আপনার আয় দ্বিগুণ হলেও মাসের শেষে আপনি সেই ‘ব্রোক’ বা পকেট ফাঁকাই থাকবেন।

আসল সমস্যাটা অঙ্কের নয়, সমস্যাটা আমাদের অভ্যাসের। মধ্যবিত্তের এমন ৪টি নীরব অভ্যাস আছে, যা আমাদের অজান্তেই আমাদের বড়লোক হতে দিচ্ছে না। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেগুলো কী কী:

১. ঋণ বা EMI-কে ‘প্রগতির প্রতীক’ মনে করা

আজকাল যেকোনো গ্যাজেট, গাড়ি বা জামাকাপড় কেনার সময় “No Cost EMI” নামক একটি মায়া হরিণ আমাদের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। আমরা ভাবি, “মাসে মাত্র ২,০০০ টাকাই তো!” কিন্তু এই ছোট ছোট EMI যোগ হয়ে কখন যে আপনার আয়ের একটা বড় অংশ গিলে খাচ্ছে, তা টেরও পান না। ক্রেডিট কার্ড বা EMI আজ আর বিপদের সঙ্গী নয়, বরং স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঋণ নেওয়াটা যে একটা মানসিক বোঝা, সেটা আমরা ভুলতে বসেছি।

২. আয়ের ওপর ভরসা করা, কিন্তু আপৎকালীন তহবিল (Emergency Fund) না রাখা

“চাকরি তো আছেই, আবার আলাদা করে জমানোর কী দরকার?”—এই মানসিকতাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। জীবন যেকোনো সময় গুগলি ফেলতে পারে। একটি আকস্মিক মেডিকেল ইমার্জেন্সি বা চাকরি চলে যাওয়ার মতো ঘটনা বছরের পর বছর ধরে করা আপনার সমস্ত পরিশ্রমকে একঝটকায় শেষ করে দিতে পারে। মধ্যবিত্তরা ব্যাক-আপ প্ল্যান বা এমার্জেন্সি বাফার তৈরি করতে বড্ড অলসতা করে।

৩. আর্থিক সামর্থ্যের আগেই দেখনদারিতে গা ভাসানো

কোনো জিনিস ‘কিনতে পারা’ আর সেই জিনিসটা ‘অ্যাফোর্ড করতে পারা’—এই দুটোর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত আছে। ব্যাংকে লোনের এলিজিবিলিটি থাকলেই যে একটা বিলাসবহুল গাড়ি বা বড় বাড়ি কিনে নিতে হবে, তার কোনো মানে নেই। সমাজ কী ভাববে, সেই প্রতিযোগিতায় নেমে আমরা নিজেদের উপার্জনের চেয়ে বেশি খরচের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছি।

৪. হিড়িক দেখে বিনিয়োগ করা, নিয়মতান্ত্রিকভাবে নয়

আজ অমুক স্টক বাড়ছে তো সেখানে টাকা ঢাললাম, কাল কোনো ক্রিপ্টো বা ট্রেন্ডিং ফান্ড নিয়ে আলোচনা হচ্ছে তো সেখানে ছুটে গেলাম—এই অস্থিরতা মধ্যবিত্তের চেনা স্বভাব। কোনো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য বা প্ল্যান ছাড়া, খামখেয়ালিভাবে বিনিয়োগ করলে সম্পদ তৈরি হয় না।

তাহলে বাঁচার উপায় কী? ‘ফাইনান্সিয়াল সারভাইভাল’ থেকে ‘ফাইনান্সিয়াল ফ্রিডম’

ধনী ব্যক্তিরা টাকা আয়ের পর একটি নির্দিষ্ট কাঠামো বা স্ট্রাকচার মেনে চলেন। তাঁদের মূলমন্ত্র হলো: প্রথমে নিরাপত্তা (Safety), তারপর স্থায়িত্ব (Stability), এবং সবশেষে স্বাধীনতা (Freedom)।

এই চক্র থেকে বেরোতে আমাদের ৩টি সহজ কিন্তু কঠোর নিয়ম মেনে চলতে হবে:

  • আগে সঞ্চয়, তারপর খরচ: মাসের শুরুতে স্যালারি পাওয়ার পর আগে নিজের ভবিষ্যতের জন্য একটা নির্দিষ্ট অংশ সরিয়ে রাখুন। তারপর যা অবশিষ্ট থাকবে, তা দিয়ে সারা মাসের খরচ চালান।
  • পরিকল্পনা করে ঋণমুক্তি: ইজি মানি বা সহজে লোন পাওয়ার ফাঁদ থেকে দূরে থাকুন। যে ঋণগুলো অলরেডি আছে, সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব শোধ করার জেদ তৈরি করুন।
  • বিনিয়োগকে অটোমেট করুন: প্রতি মাসে নিজের ইচ্ছাশক্তির ওপর ভরসা না করে SIP বা অটো-ডেবিট মোড অন করে রাখুন। মাইনে হওয়া মাত্রই যেন আপনার টাকা সঠিক জায়গায় ইনভেস্ট হয়ে যায়। ইচ্ছাশক্তি ধোঁকা দিতে পারে, কিন্তু সিস্টেম ধোঁকা দেয় না।

শেষ কথা: যেদিন আমরা মধ্যবিত্তরা আমাদের মাসের স্যালারিকে যতটা সম্মান করি, ঠিক ততটাই সম্মান একটা আর্থিক ডিসিপ্লিন বা সিস্টেমকে দিতে শিখব—সেদিনই আমাদের আসল আর্থিক স্বাধীনতা শুরু হবে। নয়তো আয়ের অঙ্কটা শুধু খাতার কলমেই বাড়বে, ব্যাংকের ব্যালেন্সে নয়!

Leave a comment