লেখক : পল্লব কুমার মান্না , FIII
মাসের ৩ -৪ তারিখ। হাতে মাইনে এসেছে সবে তিনদিন হল। অথচ পার্স হালকা। বাচ্চার স্কুলের বেতন, ঘরভাড়া, বাজার-খরচ, আর হঠাৎ কারো অসুখ — সব মিলিয়ে মাসের শেষটা যেন একটা যুদ্ধ। এই দৃশ্যটা কি চেনা লাগছে?
সত্যি বলতে, আমাদের বেশিরভাগ সংসারে টাকা নেই এমন নয় — টাকা সামলানোর পদ্ধতি নেই। আর এখানেই মাইক্রো ফিন্যান্স ম্যানেজমেন্টের আসল গল্প শুরু হয়।
টাকার হিসেব রাখা মানে দুর্বলতা নয়, শক্তি
আমাদের সমাজে একটা ভুল ধারণা আছে — হিসেব করে চলা মানে যেন কৃপণতা। অথচ স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন, শৃঙ্খলাই শক্তির প্রথম শর্ত। সংসারের টাকার ক্ষেত্রেও এই কথা সমান সত্যি।
দুটো সহজ পদ্ধতি মনে রাখুন —
- ৫০-৩০-২০ নিয়ম: আয়ের ৫০% প্রয়োজনে, ৩০% ইচ্ছেপূরণে, আর ২০% সঞ্চয় ও বিনিয়োগে।
- জিরো-বেসড বাজেট: প্রতিটা টাকার একটা কাজ ঠিক করে রাখা, যাতে মাসের শেষে কোনো টাকা “কোথায় গেল” বলে হাহাকার না করতে হয়।
যাদের আয় অনিয়মিত — চাষবাস, ছোট ব্যবসা, মরশুমি রোজগার — তাদের জন্য জিরো-বেসড বাজেট বিশেষভাবে কার্যকর। কারণ এখানে প্রতিটা মাসকে আলাদা করে সাজাতে হয়, একই ছাঁচে ফেলা যায় না।
ঋণের ফাঁদ: “সবাই নিচ্ছে, তাই নিলাম” — এই মানসিকতাই বিপদ
আজকের বাস্তবতা হল, দেশের বহু পরিবার একই সময়ে চার-পাঁচটা আলাদা জায়গা থেকে ঋণ নিয়ে বসে আছে — ব্যাঙ্ক, এনবিএফসি, মাইক্রোফিন্যান্স সংস্থা, এমনকি অনলাইন অ্যাপ। ফল যা হওয়ার তাই হয়েছে — সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মাইক্রোফিন্যান্স সেক্টরে ঋণখেলাপির হার বেড়েছে, আর তার মূল কারণ ওভার-লিভারেজ, অর্থাৎ সাধ্যের বাইরে ঋণ নেওয়া।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের একটা সহজ নিয়ম এখানে আমাদের সবার কাজে লাগতে পারে — সংসারের মোট আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি কখনোই ঋণ পরিশোধে যাওয়া উচিত নয়। এই একটা সংখ্যা মাথায় রাখলেই অনেক দুশ্চিন্তা আগেভাগে এড়ানো যায়।
জিগলার বলতেন, “আপনি যা চান তা পেতে পারেন, যদি অন্যকে তাদের চাওয়াটা পেতে যথেষ্ট সাহায্য করেন” — কিন্তু তার আগের শর্তটা হল, নিজের ঘর গোছানো থাকতে হবে। ঋণের বোঝায় ঝুঁকে থাকা মানুষ কখনোই সেই জায়গায় পৌঁছাতে পারে না।
গ্রামের অর্থনীতি বদলে দিয়েছিল যে সংগঠিত সঞ্চয়
একটা সময় ছিল, যখন গ্রামবাংলার মানুষের কাছে ব্যাঙ্ক ছিল অধরা, আর মহাজনের চড়া সুদই ছিল একমাত্র ভরসা — যে সুদ পরিবারের পর পরিবারকে ঋণের দাসত্বে বেঁধে ফেলত। এই সমস্যার উত্তর হিসেবে গড়ে উঠেছিল স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা SHG-Bank Linkage মডেল — যেখানে মহিলারা একসঙ্গে জোট বেঁধে আগে সঞ্চয় করেন, তারপর সেই সঞ্চয়ের ভিত্তিতে ব্যাঙ্কের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ঋণ পান। আজ এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংগঠিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কর্মসূচি, আর এর প্রায় সবটাই চালাচ্ছেন মহিলারা নিজেরাই।
আর গর্বের কথা — এই গল্পের একটা বড় অধ্যায় লেখা হয়েছিল আমাদেরই বাংলায়। হাওড়ার কাছে বাগনান নামের একটা ছোট্ট গ্রাম থেকে ২০০১ সালে শুরু হয়েছিল একটা উদ্যোগ, যা পরে হয়ে ওঠে ব্যান্ধন ব্যাঙ্ক। একজন মানুষের বিশ্বাস, “প্রান্তিক মানুষের হাতে যদি সংগঠিত ঋণ আর সঞ্চয়ের সুযোগ দেওয়া যায়, তাহলে বদলে যেতে পারে গোটা গ্রাম” — সেই বিশ্বাস থেকে জন্ম নিয়েছিল একটা প্রতিষ্ঠান, যা আজ লক্ষ লক্ষ পরিবারের ভরসা।
অসমেও এই গল্প কম উজ্জ্বল নয়। গবেষণা বলছে, স্বনির্ভর গোষ্ঠীর সদস্য হওয়া মহিলারা শুধু ঋণ নয়, বিশুদ্ধ পানীয় জল, স্বাস্থ্যবিধি, রান্নার জ্বালানির মতো সরকারি প্রকল্পের সুবিধাতেও সহজে পৌঁছাতে পারছেন। অর্থাৎ, সংগঠিত সঞ্চয় শুধু টাকার গল্প নয় — সম্মান আর কণ্ঠস্বর ফিরে পাওয়ারও গল্প।
তাহলে সংসারের জন্য শিখব কী?
সন্দীপ মহেশ্বরী প্রায়ই বলেন — জ্ঞান থাকা যথেষ্ট নয়, সেই জ্ঞানকে অভ্যাসে পরিণত করাই আসল কাজ। তাই তত্ত্ব নয়, আজ থেকেই যা করা যায় —
- মাসের শুরুতে বসে খাতায় (বা মোবাইলেই) আয়-ব্যয়ের একটা ছবি আঁকুন।
- নতুন কোনো ঋণ নেওয়ার আগে নিজেকে প্রশ্ন করুন — এই ইএমআই কি আমার মোট আয়ের অর্ধেক ছাড়িয়ে যাচ্ছে?
- অসংগঠিত ঋণ (মহাজন, অনলাইন অ্যাপ) থেকে দূরে থেকে ব্যাঙ্ক, স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা নির্ভরযোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক উৎসের দিকে এগোন।
- আয়-ব্যয়ের হিসেব ঠিক থাকলে তবেই আসে সুরক্ষার পালা — জীবন বিমা এখানে ঢাল হিসেবে কাজ করে, অনিশ্চয়তার দিনে পরিবারকে রক্ষা করার জন্য।
শেষ কথা
টাকা সামলানো কোনো জাদুবিদ্যা নয় — এটা একটা অভ্যাস, যেটা প্রতিদিন একটু একটু করে গড়ে তুলতে হয়। যে সংসার আজ নিজের আয়-ব্যয়ের হিসেব বোঝে, ঋণের সীমা মেনে চলে, আর সঞ্চয়কে অভ্যাসে পরিণত করে — সেই সংসারই আগামী দিনে সবচেয়ে নিশ্চিন্তে থাকে।
আপনার সংসারের গল্পটা কেমন? মন্তব্যে জানান — আপনার অভিজ্ঞতা হয়তো অন্য কোনো পরিবারের পথ দেখাবে।

Leave a Reply